1
1
সুমিত দে, নয়া দিল্লি: দিল্লি হাইকোর্টের এজলাসে ১২ এপ্রিল ২০২৬-এ এক বিস্ফোরক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল দেশের বিচারব্যবস্থা। অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজেই নিজের মামলায় সওয়াল করে মুহূর্তের মধ্যেই বদলে দিলেন মামলার চরিত্র। আদালতে দাঁড়িয়ে শুনানির মাঝেই তিনি সরাসরি আবেদন করেন, মামলাটি বিচারপতি স্বর্ণকন্ত শর্মার বেঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। তাঁর যুক্তি, এই বেঞ্চে নিরপেক্ষ শুনানি হবে না এবং তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে গভীর আশঙ্কায় ভুগছেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, সংশ্লিষ্ট বিচারক একটি আর এস এস দপ্তরে গেছেন এবং সেই আদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল, যা আম আদমি পার্টির বিরোধী।
শুধু আশঙ্কা নয়, আদালতের সামনে একে একে ১০টি পয়েন্ট তুলে ধরে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন কেন এই সন্দেহ তাঁর মনে দানা বেঁধেছে। কেজরিওয়ালের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ৯ মার্চের একটি শুনানি, যেখানে তাঁর দাবি ছিল দিল্লি হাই কোর্ট বিবাদীপক্ষের অনুপস্থিতিতেই সি বি আই-র পক্ষে রায় দেয়, তাও আবার ৪০,০০০-এরও বেশি পাতার চার্জশিট না পড়েই। এই অভিযোগ আদালতকক্ষে প্রবল আলোড়ন তোলে এবং মামলার গুরুত্বকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। প্রসঙ্গত, এই মামলা দিল্লির বহুচর্চিত আবগারি নীতি কেলেঙ্কারির বিষয়ে , যেখানে কয়েকদিন আগেই ট্রায়াল কোর্ট কেজরিওয়াল-সহ ২৩ জনকে খালাস দেয় এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ বলে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে। কিন্তু সেই রায়ের বিরুদ্ধেই হাইকোর্টে যায় সি বি আই, আর সেই আপিলের শুনানিতেই কেজরিওয়ালের এই পাল্টা আক্রমণ।

তাঁর কথায়, ওই বিচারক অতীতে এমন কিছু রায় দিয়েছেন যা সরকার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে গেছে, সেগুলোকে তিনি দৃষ্টান্ত হিসেবে টেনে এনেছেন। কেজরিওয়ালের দাবি, ইডি-র দেওয়া দুর্বল তথ্যপ্রমাণকেও এই আদালত বারবার অকাট্য বলে মেনে নিচ্ছে। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, ইডি যেভাবে রাজসাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে বয়ান নিচ্ছে, তা আদালত এড়িয়ে
যাচ্ছে । তাঁর মতে, এই মামলায় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অর্থাৎ ‘Fair Trial’-এর অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
তাঁর প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ আইনি পয়েন্ট থাকা সত্ত্বেও আদালত কেন বারবার সময় নিচ্ছে বা জামিন পিছিয়ে দিচ্ছে সেই নিয়েও। তিনি স্পষ্টই দাবি করেছেন, এই কোর্ট রুমটি আসলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, ইডি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ,যা কেজরিওয়ালের পক্ষে যেতে পারত, তা আদালতের কাছে গোপন করছে, এবং আদালত তাতে মৌন সম্মতি দিচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেছেন যে , তাঁর আইনজীবীদের সওয়াল করার সুযোগ বা গুরুত্ব কম দেওয়া হচ্ছে।

সবশেষে তাঁর পয়েন্ট ছিল—একজন অভিযুক্তের যদি বিচারকের ওপর ন্যূনতম আস্থাই না থাকে, তবে সেই বিচারকের এজলাসে শুনানি চালানো বিচারবিভাগের নৈতিকতার পরিপন্থী। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা সিবিআই কেউই কোনো ‘মানি ট্রেইল’ বা দুর্নীতির একটি পয়সাও উদ্ধার করতে পারেনি, যা গোটা মামলার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এখানেই থামেননি তিনি। আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, যারা রাজসাক্ষী হয়েছে, তাদের জামিনের বিনিময়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ান দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এই বক্তব্য মামলার আইনি দিকের পাশাপাশি রাজনৈতিক অভিঘাতকেও তীব্র করে তোলে। নিজের সওয়ালে তিনি সংবিধানের প্রসঙ্গও টেনে আনেন এবং যুক্তি দেন, অকাট্য প্রমাণ ছাড়া একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে দিনের পর দিন আটকে রাখা ভারতীয় সংবিধানের Article 21-এর পরিপন্থী, যা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে সরাসরি বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—যা যেমন সাহসী, তেমনই আইনের চোখে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে স্পষ্ট, এই লড়াই আর শুধুমাত্র আইনি সীমারেখায় আটকে নেই; এর মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।