Popular Posts

ক্যানসার-কোমা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলার ‘কুইন’ তরুণিকা ঘোষ

শ্রেয়া সেনগুপ্ত,কলকাতা: পাঁচ মিটারের বেশি দূরত্বে তাঁর দৃষ্টি ঝাপসা। বয়স মাত্র একুশ, অথচ চিকিৎসকদের মতে মানসিক বয়স থমকে রয়েছে বারোর কোঠায়। জন্মের আঠারো মাসের মাথায় ব্লাড ক্যানসার, তার পর টানা ৩২ দিনের কোমা—জীবনের শুরুতেই এমন এক ভয়ংকর লড়াই। কিন্তু সমস্ত বাধাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশ্বরেকর্ড গড়ছেন বাংলার মেয়ে তরুণিকা ঘোষ।
তরুণিকার সাফল্যের ঝুলিতে এখন একের পর এক পালক। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে আয়োজিত Virtus World Athletics Championships-এ ১৫০০ মিটার রেস ওয়াকে তিনি গড়েছেন এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড। আগের রেকর্ডের তুলনায় ১২ সেকেন্ড কম সময়ে ফিনিশ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন গোটা বিশ্বকে। এই কৃতিত্ব তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে আন্তর্জাতিক প্যারা অ্যাথলেটিক্সের প্রথম সারিতে।


শুধু ট্র্যাকেই নয়, জলে নেমেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন তরুণিকা। গত বছর গোয়ায় আয়োজিত The National Para Swimming প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইলে জিতেছিলেন রুপো। আর এ বছর হায়দ্রাবাদে সেই একই ইভেন্টে সোনা ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি। বিদেশের মাটিতে তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্ব দেখে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা নিজেদের দেশের ব্যাজ পরিয়ে তাঁকে সম্মান জানান—যা তাঁর সাফল্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরই প্রমাণ।
তরুণিকার জীবনযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মাত্র ১৮ মাস বয়সে। প্রথমে ভুল করে ‘জুভেনাইল রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস’ ভেবে চিকিৎসা চললেও অবস্থার অবনতি হলে বাবা সঞ্জয় ঘোষ ও মা সুবর্ণা ঘোষ তাঁকে নিয়ে যান মুম্বইয়ের Tata Memorial Hospital-এ। সেখানেই ধরা পড়ে তৃতীয় পর্যায়ের ‘অ্যাকিউট লিমফোব্লাস্টিক লিউকোমিয়া’—ভয়ংকর ব্লাড ক্যানসার। ২০০৮ সালে মারাত্মক সংক্রমণে টানা ৩২ দিন কোমায় ছিলেন তিনি। চিকিৎসকেরা আশা ছেড়ে দিলেও অলৌকিকভাবে মৃত্যুকে হারিয়ে ফিরে আসেন তরুণিকা। তবে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তাঁর দৃষ্টিশক্তির প্রায় ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়।
মুম্বই থেকে ফেরার পর স্কুল, মানুষের ভিড়—সবকিছুই তাঁকে ভয় পাইয়ে দিত। অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারতেন না। ঠিক সেই সময় জীবনে ভরসার হাত বাড়িয়ে দেন তাঁর দাদা। দাদাকে খেলাধুলা করতে দেখেই ধীরে ধীরে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ জন্মায় তরুণিকার।


প্রথমে সাঁতারেই নিজেকে খুঁজে পান তিনি। বাবার হাত ধরে সুইমিং পুলে নামা, জলকে বন্ধু বানিয়ে নেওয়া—সেখান থেকেই শুরু। দাদার অনুপ্রেরণায় ১৫ বছর বয়সে প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলায় যুক্ত হন। চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর বাঁ দিকের হাত ও পা পুরোপুরি সক্রিয় নয়। কলকাতার PG Hospital-এর স্পোর্টস মেডিসিন বিভাগে বিশেষ ফিজিওথেরাপি শুরু হয়। এক বছরের মধ্যেই তার সুফল মিলতে থাকে। ফিজিওথেরাপি বাঁ দিকের জড়তা কাটিয়ে শরীরে ফেরায় গতি ও ভারসাম্য।
তরুণিকা নিজেকে ভালোবেসে ডাকেন ‘কুইন’। কারণ তাঁর রক্তের গ্রুপ ‘ও নেগেটিভ’—অত্যন্ত বিরল। তাঁর ভাষায়, এটাই তাঁর “রাজকীয় রক্ত”। এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে প্রতিদিন লড়াই করতে শেখায়। বিশেষভাবে সক্ষম অ্যাথলেটদের জন্য পরিকাঠামো ও উন্নত কোচের অভাব থাকলেও তাঁর লক্ষ্য অটল।
বর্তমানে দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা অনুশীলনই তাঁর রুটিন। শৃঙ্খলা আর লক্ষ্যস্থিরতায় তিনি অনন্য। একটাই স্বপ্ন—দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা, একদিন অলিম্পিকের মঞ্চে ভারতের জার্সি গায়ে নামা।
তরুণিকা ঘোষের গল্প শুধু ক্যানসার জয় করার নয়, এটি অদম্য মানসিক শক্তির গল্প। অন্ধকার পেরিয়ে আলোয় ফেরা এক যোদ্ধার গল্প, যা প্রমাণ করে—শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের আসল পরিচয় গড়ে দেয় তার অদম্য ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *