1
1
সুমিত দে, কলকাতা:
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুললেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার কলকাতার তৃণমূল ভবনে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে বাংলার লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি “সাইলেন্ট ইনভিজিবল রিগিং”-এর অংশ।
খসড়া তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ
অভিষেক জানান, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। সেই তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭,০৮,১৬,৬৩০। গতকাল প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে মাত্র ১,৮২,০৩৬ জন, অথচ Form-7-এর মাধ্যমে ৫,৪৬,০৫৩ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১৯ জানুয়ারির নির্বাচন কমিশনের বুলেটিনে Form-7 জমার সংখ্যা যেখানে ছিল প্রায় ৪১ হাজার, সেখানে হঠাৎ করে তা কীভাবে ৫.৪৬ লক্ষে পৌঁছাল।
‘Logical discrepancy’ ও ‘unmapped’ নিয়ে প্রশ্ন
তৃণমূল নেতা দাবি করেন, শুরুতে SIR প্রক্রিয়ায় “logical discrepancy” নামে কোনো বিভাগই ছিল না। পরে এই বিভাগ তৈরি করে প্রায় ১.২ কোটি মানুষকে তার আওতায় আনা হয়। পাশাপাশি ‘unmapped’ বিভাগে থাকা ৩২ লক্ষ মামলার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে ৬০ লক্ষ under adjudication হয়ে যাওয়া নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তার অভিযোগ, ERO পোর্টাল ২১ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হওয়ার পর নিষ্পত্তি হওয়া বহু মামলাও পুনরায় অমীমাংসিত দেখানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানেনি কমিশন: অভিযোগ
অভিষেকের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেই নির্বাচন কমিশন বাধ্য হয়ে logical discrepancy তালিকা প্রকাশ, শুনানি কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং নথি জমার acknowledgement চালু করে। তাঁর অভিযোগ, কমিশন একতরফাভাবে SOP তৈরি করেছে, যা আদালতের নির্দেশবিরোধী।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামও ‘Under Adjudication’
তিনি জানান, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটার রিচা ঘোষ, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন, ক্রিকেটার মহম্মদ শামি, রাজ্যের মন্ত্রী ডা. শশী পাঁজা, মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তীসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির নামও under adjudication তালিকায় রয়েছে। একাধিক বিধায়ক ও প্রশাসনিক আধিকারিকের নামও এই তালিকায় থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
বিজেপির ‘লক্ষ্যমাত্রা’ অভিযোগ
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুরের বক্তব্য উল্লেখ করে অভিষেক দাবি করেন, আগেই ১.২০-১.২৫ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, ৫৮ লক্ষ (খসড়া তালিকা) + প্রায় ৬ লক্ষ (Form-7) + ৬০ লক্ষ under adjudication মিলিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১.২৪ কোটি।
জেলার ভিত্তিতে বড়সড় প্রভাবের দাবি
তিনি জানান, কোচবিহারে ২.৩৮ লক্ষ, উত্তর দিনাজপুরে ৪.৮ লক্ষ, মালদায় ৮.৫ লক্ষ এবং মুর্শিদাবাদে ১১ লক্ষের বেশি ভোটার under adjudication অবস্থায় রয়েছেন। কিছু বিধানসভা কেন্দ্রে ৮০-৯০ শতাংশ ভোটারকেও এই তালিকায় রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কড়া আক্রমণ
অভিষেকের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বিজেপির “সহযোগী সংস্থা”-য় পরিণত হয়েছে এবং কেন্দ্রের চাপে কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদেরও ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
মানুষের দুর্ভোগের প্রসঙ্গ
সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত শুনানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অন্তত ১৬০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা মহিলা থেকে বৃদ্ধ—অনেককেই দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নির্বাচন পিছোনোর চক্রান্তের অভিযোগ
অভিষেকের দাবি, বিপুল সংখ্যক মামলা under adjudication রেখে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর বক্তব্য, “৫ মে-র মধ্যে নির্বাচন করা বাস্তবে সম্ভব নয় যদি ৬০ লক্ষ মামলা বাকি থাকে।”
কর্মীদের নির্দেশ
তিনি জানান, তৃণমূল কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষকে DEO অফিসে আবেদন ও Form-6 জমা করতে সাহায্য করা হয়। একইসঙ্গে তিনি ভোটারদের আতঙ্কিত না হওয়ার আবেদন জানান।
শেষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, “২০২৬ সালে বিজেপির আসন সংখ্যা ৫০-এর নিচে নেমে যাবে। আদালত ও জনগণের আদালত—দুই জায়গাতেই সত্য সামনে আসবে।”