1
1
সুমিত দে,জলপাইগুড়ি:
জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির টাউন ক্লাব মাঠে আয়োজিত জনসভা থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করলেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee। অন্নপূর্ণা পুজোর শুভক্ষণে অনুষ্ঠিত এই সভায় উন্নয়নমূলক প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষক স্বার্থ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সমালোচনা—বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন তিনি।
উন্নয়ন প্রকল্পের খতিয়ান তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী
মুখ্যমন্ত্রী জানান, ময়নাগুড়ি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় এলাকা এবং গত কয়েক বছরে এখানে একাধিক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। জলপেশ শিব মন্দিরে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে স্কাইওয়াক নির্মাণ, মহাকাল মন্দিরের কাজ, আইটিআই পলিটেকনিক কলেজ ও ১০০ শয্যার গ্রামীণ হাসপাতাল গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি এসএনসিইউ ও ফেয়ার প্রাইস শপ চালু করা হয়েছে বলেও জানান।
ময়নাগুড়ি ব্লকে ৪১টি বড় ও মাঝারি পানীয় জল প্রকল্প চালু হওয়ায় দুই লক্ষাধিক মানুষ উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রতিটি ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রাস্তা ও পরিকাঠামো উন্নয়ন
তিনি বলেন, ময়নাগুড়ি ব্লক রেল স্টেশন সংলগ্ন ১৪ কিলোমিটার রাস্তা ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছে। জর্দা নদীর উপর সেতু নির্মাণ, দোমোহনী বাজার থেকে তিস্তা ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার এবং ভেটেপট্টি-হেলাপোখরি ও ময়নাগুড়ি-বার্নিশ রোডের বিভিন্ন অংশ উন্নয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ১০০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার কিষাণ মান্ডি তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। জলপাইগুড়ি জেলার উন্নয়নে মোট ২৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
সামাজিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বার্তা
সভায় কোচ, আদিবাসী ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলায় সব ধর্ম ও ভাষার মানুষ একসঙ্গে বাস করে। খাদ্যাভ্যাস বা ভাষা নিয়ে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে তিনি দাবি করেন, রাজ্য সরকার সব সম্প্রদায়ের উন্নয়নে কাজ করছে।

বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ
বক্তৃতায় বিজেপির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নোটবন্দি থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা সংশোধন পর্যন্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে। বিবাহিত মহিলাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এনআরসি প্রসঙ্গ টেনে দীর্ঘদিন বসবাসকারী মানুষকে বিদেশি বলা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে।
কৃষক ও সামাজিক প্রকল্পে আশ্বাস
জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারে বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আলু চাষিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। ‘বাংলা শস্য বিমা’ প্রকল্পে কৃষকদের প্রিমিয়াম দিতে হয় না এবং রাজ্য সরকারই সেই ব্যয় বহন করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্য সাথী, বিনামূল্যে রেশন ও চা সুন্দরী প্রকল্প চালু থাকবে বলেও আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বর্ধিত ভাতা নির্ধারিত সময়ের আগেই দেওয়া শুরু হয়েছে এবং এই সুবিধা বন্ধ হবে না।
কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক ও মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গ
মুদ্রাস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এসব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাজ্যের হাতে নেই। কেন্দ্রীয় প্রকল্পে শর্তের কারণে অনেক মানুষ সুবিধা পান না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রাজ্যের প্রকল্পগুলো সর্বজনীন বলেও দাবি করেন।

নির্বাচন ও ভোটাধিকার প্রসঙ্গ
সভায় ভোট কেনাবেচার অভিযোগ তুলে ভোটারদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সম্মান জানালেও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আবেদন করেন তিনি। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় মানুষকে সচেতন থাকার বার্তাও দেন।
নির্বাচনী বার্তা
সভা শেষে তিনি দাবি করেন, আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস জয়ী হবে এবং কন্যাশ্রী, ঐক্যশ্রী, যুবশ্রী, রূপশ্রী ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পই দলের পরিচয় বহন করে। দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে থাকার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় ধর্ম।