Popular Posts

পায়ে-পায়ে কলকাতা: লালবাজার থেকে আর্মানি গির্জা—ইতিহাসের গলিপথে এক রবিবারের হাঁটা

সুমিত দে, কলকাতা:‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা, হেঁটে দেখতে শিখুন।’ কবি শঙ্খ ঘোষের এই অমোঘ কথাই যেন পথ দেখাল আমাদের নতুন সিরিজ #পায়েপায়েকলকাতা-র। আগামী বেশ কিছু রবিবার শহরের অলিগলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে তুলে ধরা হবে তিলোত্তমার ইতিহাস—চেনা জায়গার অচেনা গল্প।
শুরুটা হলো শহরের একেবারে কেন্দ্র থেকে—লালবাজার। অনেকের কাছে লালবাজার মানেই একটি লাল রঙের বিশাল ভবন। কিন্তু আদতে এটি একটি বিস্তৃত এলাকা, যার প্রতিটি কোণে লুকিয়ে ইতিহাস। জানেন কি, এখান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম চা নিলাম কেন্দ্র—ক্যালকাটা টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন। আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও, কলকাতায় চায়ের নিলাম চলছে অন্তত ১৮৬১ সাল থেকে। আজও এখানেই নিলাম হয় আসাম ও দার্জিলিংয়ের বিশ্ববিখ্যাত চায়ের।


আরও একটু পিছনে হাঁটতে চাইলে, লালবাজারের ‘ইন গেট’ থেকে সোজা ঢুকে পড়লেই আর.এন. মুখার্জি রোড। মাত্র ২০০ মিটার এগোলেই চোখে পড়বে ওল্ড মিশন চার্চ—যার নামেই একদিন এই রাস্তার নাম ছিল মিশন রো। ১৭৭০ সালে সুইডিশ পাদ্রী যোহান জাকারিয়া কিয়েরনান্ডারের উদ্যোগে নির্মিত এই গির্জা প্রথমে ছিল টকটকে লাল রঙের। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই গির্জার ছায়া যে দীঘিতে পড়ত, সেটিই পরবর্তীকালে পরিচিত হয় লালদীঘি নামে—সেখান থেকেই কি লালবাজার? মতভেদ থাকলেও গল্পটি আজও রোমাঞ্চ জাগায়।


এই গির্জার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন কবিশ্রেষ্ঠ মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আজও গির্জার দেওয়ালে সেই ঘটনার স্মৃতিফলক নীরবে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
যদিও ওল্ড মিশন চার্চ কলকাতার প্রাচীনতম গির্জা নয়। সেই মর্যাদা রয়েছে Church of the Holy Nazareth—লোকমুখে আর্মেনিয়ান বা আর্মানি গির্জা। জোব চার্নকের সময়কালেই, অর্থাৎ ১৬৯০-এর দশকে, কলকাতায় বসতি স্থাপন করেন পশ্চিম এশিয়া থেকে আসা আর্মেনিয়ানরা। তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন আজও ছড়িয়ে রয়েছে শহরের বুকে—সুকিয়া স্ট্রিট, স্টিফেন কোর্ট, কিংবা আর্মেনিয়ান কলেজের মতো স্থানে।


লালবাজার সদর দফতর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গির্জা প্রথমে কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল ১৭০৭ সালে। পরবর্তীতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর ১৭২৪ সালে ইট-চুন-সুরকিতে নতুন করে নির্মাণ হয়। ভেতরে ঢুকলে আজও দেখা যায় ঘণ্টাঘর আর কলকাতার প্রাচীনতম কবরগুলির কয়েকটি—যেন সময়ের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ানো ইতিহাস।
একদিনে এত হাঁটা যথেষ্ট। আজ এখানেই বিরতি।
পায়ে-পায়ে কলকাতা আবার ফিরবে আগামী রবিবার—নতুন পথ, নতুন গল্প নিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *