1
1
সুমিত দে, কলকাতা:
শহর কলকাতার ব্যস্ত রাস্তাঘাটের নীচে লুকিয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস। লালবাজার থেকে বিবাদী বাগের দিকে হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায় St. Andrew’s Church-এর সামনে। গির্জার পাশের রাস্তাটির নাম ‘ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট’। নামের মধ্যেই প্রশ্ন—কোথায় সেই কোর্ট? কতটা ‘ওল্ড’?
মেয়র’স কোর্টের স্মৃতি
ইতিহাস বলছে, ১৭২৭ থেকে ১৭৩২ সালের মধ্যে এই এলাকাতেই গড়ে ওঠে কলকাতার প্রথম আদালত ‘মেয়র’স কোর্ট’। সাধারণ মানুষের মুখে যা পরিচিত ছিল ‘ওল্ড কোর্ট হাউজ’ নামে। প্রায় তিন দশক পরে আদালত ভবনের বিস্তার হলেও ১৭৯২ সালে তা বিপজ্জনক ঘোষণা করে ভেঙে ফেলা হয়। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ২৩৪ বছর আগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া সেই ভবনের স্মৃতিই বয়ে নিয়ে চলেছে শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তা।

এই ওল্ড কোর্ট হাউজেই ১৭৭৫ সালে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়ান Maharaja Nandakumar। দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল Warren Hastings-এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের বিচারে ফাঁসির দণ্ড হয় নন্দকুমারের—যা আজও ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়।
জিপিও ও পুরনো ফোর্ট উইলিয়ামের ছাপ
ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট থেকে কয়েক পা এগোলেই লালদীঘির পশ্চিম পাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে General Post Office। বর্তমান জিপিও ভবনের জায়গাতেই একসময় ছিল প্রাচীন ফোর্ট উইলিয়াম। সেই সময় গোটা এলাকা ছিল গোবিন্দপুর গ্রামের অন্তর্গত—সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা মিলিয়েই গড়ে উঠেছিল আজকের কলকাতা।

১৭৫৬ সালে নবাব Siraj ud-Daulah ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমণ ও দখল করেন। তারই ফলশ্রুতিতে ১৭৫৭ সালে সংঘটিত হয় Battle of Plassey। স্থানীয়দের দাবি, জিপিও-র পাশের একটি লোহার গেটের কাছে বহু বছর আগেও মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে থাকত একটি কামানের মুখ—যা সেই সময়কার যুদ্ধেরই স্মারক হতে পারে।
‘ব্ল্যাক হোল অফ ক্যালকাটা’ বিতর্ক
সিরাজের আক্রমণের সময়েই ঘটে কথিত ‘ব্ল্যাক হোল অফ ক্যালকাটা’ ঘটনা। ব্রিটিশ সেনা অফিসার জন হলওয়েলের বর্ণনা অনুযায়ী, ফোর্ট উইলিয়ামের একটি ছোট সেন্ট্রি ঘরে বহু ইংরেজ নারী-পুরুষ ও শিশুকে বন্দি করে রাখা হয় এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অনেকের মৃত্যু হয়। যদিও ঐতিহাসিকদের একাংশ এই ঘটনার বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তবু ব্রিটিশ শাসনামলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় ‘ব্ল্যাক হোল’ স্মৃতিসৌধ।

বর্তমান Writers’ Building-এর সামনে প্রথমে সেই স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হলেও ১৯৪০-এর দশকে Subhas Chandra Bose সহ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দাবিতে তা স্থানান্তরিত করে ব্রিটিশ সরকার।
আজ সেই স্মৃতিসৌধ রয়েছে অন্যত্র, তবে ইতিহাসের পদচিহ্ন মুছে যায়নি। ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট থেকে জিপিও—প্রতিটি ইট, প্রতিটি মোড়ে জড়িয়ে আছে কলকাতার ঔপনিবেশিক অতীতের স্মৃতি।
পরের রবিবারের পদযাত্রায় খোঁজ মিলতে পারে সেই স্থানান্তরিত স্মৃতিসৌধের বর্তমান