1
1
বঙ্গ Live কলকাতা ডেস্ক:মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েলের লাগাতার হামলায় দমে না গিয়ে পাল্টা আক্রমণে সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে ইরান। শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে তেহরান যে অভিনব রণকৌশল নিচ্ছে, তা নিয়েই এখন আলোচনা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি শক্তির লড়াইয়ের বদলে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে ইরান। সেই লক্ষ্যে তারা একদিকে আরবের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।

আরব জুড়ে হামলার বিস্তার
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, সংঘর্ষকে গোটা আরব অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে চাইছে তেহরান। তাই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিতে লাগাতার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে।
এই হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে—
হাইপারসনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
কামিকাজ়ে ড্রোন
দূরপাল্লার আক্রমণকারী ড্রোন
এই আক্রমণের রোষ থেকে রক্ষা পায়নি ইজ়রায়েলও।
‘সস্তা ড্রোন, দামি প্রতিরক্ষা’— ইরানের নতুন চাল
জন্স হপকিন্স স্কুল অফ অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়-এর অধ্যাপক ভ্যালি নাসরের মতে, ইরান প্রথমে সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে বাধ্য করছে।
এর ফলে ইজ়রায়েল ও মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহার করতে হচ্ছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘ইন্টারসেপ্টর’ ক্ষেপণাস্ত্র। সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লেই ইরান আঘাত হানছে হাইপারসনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে।
এই কৌশলে যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে তুলতে চাইছে তেহরান।

হরমুজ় প্রণালী বন্ধ: জ্বালানি বাজারে চাপ
ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত পদক্ষেপ হল হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া।
দৈর্ঘ্য: প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার
প্রস্থ: ৩৩–৩৯ কিলোমিটার
বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়
এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বন্ধ থাকলে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি কয়েক সপ্তাহ এই পথ বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
ধর্মীয় আবেগকে হাতিয়ার
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘর্ষকে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ফতেহ খাইবার’।
৬২৯ সালে আরবের খাইবার অঞ্চলে সংঘটিত যুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরে এই নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের শিয়া মুসলিমদের আবেগকে সংঘর্ষের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে তেহরান।

মিত্র বাহিনীর সক্রিয়তা
প্রথমদিকে ইরান একাই লড়াই চালালেও এখন তাদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠী। এর মধ্যে রয়েছে—
লেবাননের হিজ়বুল্লা
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী
ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া গোষ্ঠী
এই বাহিনীগুলি সক্রিয় হলে সংঘর্ষের মাত্রা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেতৃত্বে পরিবর্তন
যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। এরপর ইরানের প্রশাসন তিন সদস্যের একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করে।
সূত্রের খবর, নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনেইয়ের পুত্র মোজতবা হুসেইনিকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
দুই বাহিনীর সমন্বয়
ইরানের সামরিক কাঠামো মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—
আর্টেশ — সরকারি সেনাবাহিনী
ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) — সর্বোচ্চ নেতার অধীন বিশেষ বাহিনী
গত বছরের সংঘর্ষে এই দুই বাহিনীর সমন্বয়ের অভাব দেখা গেলেও এবারের যুদ্ধে তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে বলে দাবি পশ্চিমি বিশ্লেষকদের।

সামনে কী হতে পারে?
তবে ইরানের এই কৌশল কত দিন সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইজ়রায়েল ইতিমধ্যেই ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাত হানছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। কুর্দ বিদ্রোহীদের সহায়তা করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফলে পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত কোন দিকে গড়াবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।