Popular Posts

অনুপ্রবেশ থেকে এসআইআর—পাল্টা চার্জশিটে শাহকে ধুইয়ে দিল তৃণমূল

শ্রেয়া সেনগুপ্ত, কলকাতা:
বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজ্যে বাড়ছে জাতীয় নেতাদের রাজনৈতিক সফর। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রাজ্যে আগমনও এখন প্রায় নিয়মিত। সেই আবহেই শনিবার কলকাতার একটি হোটেল থেকে বাংলার বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘চার্জশিট’ পেশ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah। তবে বিজেপির অভিযোগের প্রতিটি পয়েন্ট ধরে পাল্টা আক্রমণে নামল শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। অনুপ্রবেশ, উন্নয়ন, নারী নিরাপত্তা থেকে শুরু করে এসআইআর—প্রতিটি ইস্যুতেই সরাসরি জবাব চাওয়া হয় শাহের কাছে।
অনুপ্রবেশ ইস্যুতে পাল্টা প্রশ্ন
বাংলা–বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে শাহ দাবি করেন, এর ফলে রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে এবং এবারের নির্বাচন সেই পরিবর্তন রুখে দেওয়ার লড়াই।
এই বক্তব্যের জবাবে তৃণমূলের তরফে শিক্ষা মন্ত্রী Bratya Basu প্রশ্ন তোলেন, সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব তো কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকেরই। সীমান্ত অরক্ষিত রেখে কীভাবে অনুপ্রবেশের অভিযোগ তোলা হয়? তাঁর কটাক্ষ, “জনবিন্যাস ঠিক করতে কী আরেকটা গুজরাট বানাতে চান?”
একই সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুতেও কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। সাংসদ Mahua Moitra কাশ্মীরের পহেলগাম হামলার প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন ব্যর্থ হল কেন্দ্র। এ ছাড়া লালকেল্লা সংলগ্ন বিস্ফোরণের ঘটনাও তুলে ধরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন তৃণমূলের আরেক সাংসদ Kirti Azad।


উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্র–রাজ্য সংঘাত
শাহ তাঁর বক্তব্যে বাংলায় উন্নয়নের অভাবের অভিযোগ তোলেন এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে উন্নয়নের পথ খুলবে বলে দাবি করেন।
এর পাল্টা জবাবে তৃণমূলের দাবি, কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে রেখেছে। ব্রাত্য বসুর বক্তব্য, প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ এখনও বকেয়া। জল জীবন মিশন ও গ্রামীণ আবাসনের মতো প্রকল্পের টাকা আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।
মহুয়া মৈত্র আরও কড়া ভাষায় কেন্দ্রকে আক্রমণ করে বলেন, অপমান–বঞ্চনা–দোষারোপ—এই তিন ধাপেই বাংলাকে টার্গেট করছে কেন্দ্র। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার সময় দেশের ঋণ ছিল ৫৬ লক্ষ কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে প্রায় ২০০ লক্ষ কোটিতে পৌঁছেছে।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে পাল্টা আক্রমণ
শাহ তাঁর চার্জশিটে বাংলাকে নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্য বলে দাবি করেন।
এর জবাবে তৃণমূল প্রশ্ন তোলে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির পরিসংখ্যান নিয়ে। মহুয়া মৈত্র বলেন, এনসিআরবি-র ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী নারী নির্যাতনের ঘটনায় শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থান। ধর্ষণের ঘটনাতেও শীর্ষ তিনে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিই রয়েছে।
ব্রাত্য বসু আরও প্রশ্ন তোলেন, উন্নাও বা হাথরসের মতো ঘটনায় কেন বিজেপি নীরব। মনিপুরের ঘটনাতেও কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে তিনি সমালোচনা করেন।
এসআইআর ইস্যুতে নতুন বিতর্ক


এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রসঙ্গও এদিন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে। শাহ দাবি করেন, বাংলায় অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্যই তৃণমূল এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে।
এই অভিযোগ খারিজ করে মহুয়া মৈত্র বলেন, এসআইআর-এর ফলে সীমান্ত এলাকার বহু হিন্দু ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি বিহারের উদাহরণ টেনে দাবি করেন, অনুপ্রবেশকারীদের খোঁজের অজুহাতে সাধারণ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার নজির আগেও রয়েছে।
‘ভিকটিম কার্ড’ মন্তব্যে উত্তাপ
মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee-কে ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলার অভিযোগে আক্রমণ করেন শাহ। তাঁর মন্তব্য, বিভিন্ন সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহানুভূতি আদায়ের রাজনীতি করেন।
এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেয় তৃণমূল। ব্রাত্য বসু কটাক্ষ করে বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী ব্যান্ডেজ পরেছেন ঠিকই, কিন্তু দিনে পাঁচবার পোশাক বদলের মতো ব্যান্ডেজ বদল করেন না।”
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বিজেপি একটি পিতৃতান্ত্রিক দল এবং নারীদের প্রতি তাদের মন্তব্য ও আচরণ বারবার সেই মানসিকতাই প্রকাশ করে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে বিজেপির ‘চার্জশিট’-এর জবাবে তৃণমূলের পাল্টা আক্রমণে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হয়ে উঠল। অনুপ্রবেশ থেকে নারী নিরাপত্তা—প্রতিটি ইস্যুতেই কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সংঘাত এখন স্পষ্ট। আগামী দিনে এই বিতর্ক যে নির্বাচনী প্রচারের বড় ইস্যু হয়ে উঠবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *