1
1
সুমিত দে,কলকাতা:অদম্য মনোবল, স্মৃতির তীক্ষ্ণতা আর তদন্তকারী অফিসারদের নিরলস তৎপরতায়—নৃশংস হত্যাচেষ্টার মামলায় মিলল ন্যায়। ঘটনার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অভিযুক্ত সন্দীপ সাউ-কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল আদালত। বিচার পেল সেই কিশোরীর হার-না-মানা লড়াই।
এই প্রথম। সংক্ষিপ্ত চাকরিজীবনে এমন ঘটনা আগে দেখেননি চিৎপুর থানার সাব-ইনস্পেকটর সৌরভ রায়। অচৈতন্য এক কিশোরী—গলার গভীর ক্ষত থেকে অঝোরে রক্তক্ষরণ। ধারালো অস্ত্রের আঘাতের পাশাপাশি শ্বাসরোধের স্পষ্ট চিহ্ন। পরিবারের সদস্যরাই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করেন, কিন্তু কেউই ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিতে পারেননি। বাড়ি থেকে উধাও ছিল কিছু গয়নাগাটি। কিশোরী কথা বলার অবস্থায় নেই—মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই।
১৮ মার্চ, ২০২৫। হাসপাতালে কোনও সূত্র না পেয়ে থানায় ফিরলেও ওসি কান্তিময় বিশ্বাস ফেরত পাঠান সৌরভকে। নির্দেশ একটাই—হাসপাতালেই থাকো, লেগে থাকো। সেই ‘লেগে থাকা’-ই পরদিন ফল দেয়। আংশিক সুস্থ হয়ে কলম ধরল কিশোরী। হাসপাতালের বেডে শুয়েই সে আঁকল খোয়া যাওয়া গয়নার ছবি, লিখে দিল ঘটনার বিবরণ। গুরুতর আহত অবস্থাতেও তার স্মৃতিশক্তি ও মানসিক দৃঢ়তা তদন্তকারীদের হতবাক করে দেয়।

ঘটনার নেপথ্য
কিশোরীর ক্যান্সার-আক্রান্ত বাবার ভেলোরে চিকিৎসা চলছিল। গয়না বিক্রি করে টাকা জোগাড়ের কথা বলে বাড়িতে আসেন তার সাঁতারের প্রশিক্ষক সন্দীপ সাউ। বাড়িতে প্রায় নিত্য যাতায়াত থাকায় বিশ্বাসের সুযোগ নেয় সে। বাড়ির ওই অংশে কিশোরী একাই ছিল। সরল বিশ্বাসে গয়না তুলে দেওয়ার পরই শুরু হয় অতর্কিত হামলা।
সরাসরি আঘাত না করে সন্দীপ কৌশলে জানায়, সাঁতারের জন্য ঘাড়ের পেশি মজবুত করার ব্যায়াম করাবে। পিছন দিক থেকে তোয়ালে পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে। জ্ঞান হারানোর পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় আঘাত করে দরজা বন্ধ করে পালিয়ে যায়।
অদম্য প্রত্যাবর্তন
রক্তাক্ত অবস্থাতেই জ্ঞান ফেরে কিশোরীর। শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে দরজা খুলে কাকিমার কাছে পৌঁছয়। সেখান থেকেই হাসপাতালে ভর্তি, থানায় অভিযোগ।
মেয়েটির লিখিত বয়ান ও আঁকা ছবির ভিত্তিতে ১৯ মার্চ গ্রেফতার হয় সন্দীপ। ময়দার বস্তায় লুকোনো গয়নাও উদ্ধার হয়—হুবহু মিলে যায় কিশোরীর আঁকা ছবির সঙ্গে। মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা করেন তদন্তকারী সৌরভ রায়; সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ওসি কান্তিময় বিশ্বাস ও চিৎপুর থানা-র টিম।
রায়

গত সপ্তাহে বিচারপর্ব শেষ হয়। ঘটনার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করে। ন্যায় পেয়েছে সেই কিশোরীর অদম্য লড়াই।
কিশোরীকে স্যালুট—আগামীর জন্য অফুরন্ত শুভেচ্ছা।
অভিনন্দন তদন্তকারী অফিসার সৌরভ রায়, ওসি কান্তিময় বিশ্বাস এবং চিৎপুর থানার পুরো টিমকে।